বাংলাদেশের গারোদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা কর

বাংলাদেশের গারো এথনিক গোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ কর।

অথবা,  বাংলাদেশের গারো সম্প্রদায়ের সামাজিক গতিশীলতা আলোচনা কর। 


 ভূমিকা: বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি উপজাতি সম্প্রদায় রয়েছে। এদের মধ্যে, গারো সম্প্রদায় অন্যতম। এ উপজাতিদের মধ্যে সম্প্রদায় বেশ দৃঢ়। বিভিন্ন প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে বলে তাদের একতাবোধ বেশ দৃঢ় থাকে। এরা যাযাবর প্রকৃতির । বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে গেলেও কাজ শেষে আবার নিজের স্থায়ী আবাসনে ফিরে আসে। প্রতিটি উপজাতিই বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী।

বাংলাদেশের গারোদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা


গারোদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা: অন্যান্য উপজাতির মতো গারোদেরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। নিম্নে বাংলাদেশের গারো সমাজের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা আলোচনা করা হলো-


১. নামকরণ: গারো পাহাড়ের নামানুস্যায় গারোদের নামকরণ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, গারো সম্প্রদায় যে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে সে অঞ্চলের পাহাড়গুলোর নামকরণ করা হয়েছে তাদেরই নামানুসারে।


২. ভৌগোলিক অবস্থান: বাংলাদেশের ময়ানমনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায় গারোদের বাস। এছাড়াও ঢাকা জেলার উত্তরাঞ্চল রংপুর জেলার উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং সিলেট চা বাগানে সামান্য কিছু গারো দেখতে পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ গারো থাকে ভারতের আসামের মেঘালয়ে।


৫. জনসংখ্যা: বর্তমানে বাংলাদেশে গারোদের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। এর মধ্যে ময়মনসিংহে ৬০ হাজারের মতো, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় ২০ হাজার গারো বসবাস করে। ঢাকা, রংপুর এবং সিলট অঞ্চলে বাস করে প্রায় ১০ হাজার গারো। এছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতে মোট, গারোর সংখ্যা ৩,১৭,৮৪২ জন।


৪. ভাষা: গারোদের ভাষার স্থানীয় নাম মান্দিভাষা বা গারো ভাষা। গারোরা যে ভাষায় কথা বলে তা মূলত সিনো টিবেটান ভাষার অন্তর্গত। গারোদের নিজস্ব কোনো লিপি বা অক্ষর নেই। তাব বর্তমানে ভারতের গারোরা আসাম অঞ্চলে রোমান হরফে এবং বাংলাদেশের গারোরা বাংলা হরফে গারো ভাষা লিখছে।


৫. নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়: গারোরা মঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর অর্ন্তগত। তাদের মুখাকৃতি গোলাকার এবং চ্যাপ্টা, নাক প্রশস্ত, কপাল ক্ষুদ্রাকৃতি, কান বড় এবং ঠোঁট মোটা। তাদের চুল কালো, কোঁকড়ানো, পুরুষের মুখে দাঁড়ি, গোঁফ কম। তাদের উচ্চতা  ৫ ফুটের বেশি নয়।


৬. ধর্ম: বর্তমানে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ গারোই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। ২ তাণ মুসলমান ও হিন্দু। বাকি ৮ ভাগ ঐতিহ্যবাহী ধর্মের লোক। গারোদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মের নাম সাংসারেক। এরা হিন্দুদের মতো পূজা করে থাকে।


৭. শ্রেণি ও গোত্র বিভাগ: পারো সম্প্রদায় প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা- আচ্ছিক ও লামদানির। আচ্ছিক শ্রেণিয় গারোদের গারো পাহাড়ের অভ্যন্তরে গহীন অরণ্যে বাস করতে দেখা যায় এবং লামদানি শ্রেণির গারোদেরকে ময়মনসিংহ জেলার নালিতাবাড়ি, হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর, কমলাকান্সা, শ্রীবর্দী প্রবৃতি এলাকায় অধিক সংখ্যায় বসবাস করতে দেখা যায়। আচ্ছিকদের তিনটি শ্রেণি হলো অয়, আচেং, দোয়াল। লামদানিদের তিনটি শ্রেণি হলো- সমীন, সারাক, সারগমা।


৮. সামাজিক সংগঠন: গারো সমাজ প্রধানত মাতৃসূত্রীয়। গারোদের বৃহৎ গোত্রের নাম চাটচি। যার অর্থ আত্মীয় বা জাতি। যারা চাটছি গোত্রভুক্ত তারা সবাই একে অপরের সঙ্গে মাতৃসূত্রীয় রীতিতে সম্পর্কযুক্ত। পাঁচ প্রকার চাটছি গোত্র রয়েছে। যথা- মারাক, মোমিন, মিয়া, সংসা এবং আবেং।


৯. পরিবারগ্রখ্য: যেহেতু গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক তাই সম্পত্তি ও বশে নাম মাতৃসূত্রীয় ধারায় বর্তায়। বিবাহের পর দম্পতি স্ত্রীর বাবার গৃহে বসবাস করে। তাই গারো পরিবার মাতৃপ্রধান।


১০. বিবাহপ্রথা: গারো সমাজে Monogamy বা যুগল বা একবিবাহ রীতির প্রচলন আছে। গারো সমাজে প্যারালাল কাজিন বিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু ক্রস কাজিন বিবাহ অনুমোদিত। গারো বিবাহে কন্যাকে কোনো পণ দিতে হয় না।


১১. বিবাহবিচ্ছেদ: গারোদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ খুবই কম। বিবাহবিচ্ছেদ যদি ঘটে তবে তা সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। বিচ্ছেদে স্বামী স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দোষী ব্যক্তির গোষ্ঠীর লোক অন্য পক্ষকে জরিমানা দেয়ার শর্তে বিবাহবিচ্ছেন ঘটে।


১২. খাদ্য: বাংলাদেশি গারোরা হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, শুরুর প্রভৃতি খায়। মদ তাদের প্রধান বা অপরিহার্য পানীয়। ধর্মীয় বিধি নিষেধ অনুসারে তারা কখনো বিড়াল ভক্ষণ করে না।


১৩. পোশাক-পরিচ্ছদ: পোশাক পরিচ্ছেদ বিশেষ বাহুল্য নেই। গারোদের পোশাক-পরিচ্ছদ খুবই সাধারণ। পুরুষেরা ধুতি ব্যবহার করে। মেয়েরা ব্লাউজ বা লুঙ্গির মতো বুকে টুকরো কাপড় পরিধান করে।


১৪. শিক্ষা: বাংলাদেশের গারোরা বর্তমানে শিক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারির মাধ্যমে এরা ক্রমশ শিক্ষিত হয়ে উঠছে। এদেশের গারোরা বাংলা হরফে গারো ভাষা শিখছে। বর্তমানে শতকরা প্রায় ২৯ ভাগ গারো শিক্ষিত। তবে গারোদের নিজস্ব কোনো লিপি বা বর্ণমালা নেই।


১৫. অর্থনীতি: জুম চাষই গারোসের প্রধান অর্থনৈতিক কাজ। বর্তমানে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ১৯৫০ সালের পর থেকে জুম চাষ বন্ধ। তার পরিবর্তে বর্তমানে গারোরা হাল চাষে অত্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা কৃষিতে ধান সবজি ও ফল উৎপাদন করে থাকে। পূর্বে পারো সমাজে অর্থনৈতিক বৈষমা ছিল না বললেই চলে।


১৬. বিচারব্যবস্থা /রাজনীতি ও নেতৃত্ব: গারো সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিচার কাজ করে থাকে। তবে একক নেতৃত্ব গারোসমাজে গড়ে ওঠেনি। অবশ্য বর্তমানে গাত্রোসমাজে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসন যন্ত্রের বিকাশ ঘাটছে বিধায় বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রাম সরকার প্রভৃতি গড়ে উঠেছে এবং বিচার আচারেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।


১৭ সমাজ পরিবর্তন: আধুনিক সভ্যতার প্রভাবে গারো সমাজেও ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আর পরিবর্তন কেবল সংস্কৃতি নয়। শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়।


১৮. অন্ত্যষ্টিক্রিয়া: গারোদের মতে, দেহ থেকে আত্মা বিদায় নিলেই মানুষের মৃত্যু হয়। আত্মা অমর, তাদের বিশ্বাস মৃত্যুর পর আত্মা 'চিকমাং' নামক স্থানে চলে যায়। 'চিকমাং' হালো মৃত্যুর দেশ। তাদের বিশ্বাস গারো পাহাড়ের দক্ষিণ পূর্বে পাহাড়ের চূড়ায় 'চিকমাং' অবস্থিত। তাদের বিশ্বাস চিকমাং এ কেবল মৃতরাই যেতে পারে। জীবিতরা পারে না।


উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বর্তমানে যদিও গারো সমাজে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে তবু তাদের জীবনপ্রণালি থেকে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে এখনো আদিবাসীদের অস্তিত্ব রয়েছে। অপরাপর উপজাতীয় সমাজের মতো গারো সমাজের শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, রাজনীতি অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, ধর্মীয় রীতি-নীতি, বিবাহপদ্ধতি এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষণীয় বস্তুত এসব পরিবর্তনের মূলে রয়েছে  গারোসমাজে শিক্ষাদীক্ষার প্রসার।

No comments:

Post a Comment